বৃহস্পতিবার, ১৫ আগস্ট, ২০১৯

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ

বাঙালি জাতি হিসেবে আমাদের ইতিহাস ভুলে গেলে চলবে না। ইতিহাস যে জাতি ভুলে যায়, সে জাতির ভাগ‌্যে কলংকিত ইতিহাসের পুণরাবৃত্তি ঘটে। আমরা নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার হত‌্যাকারীদের বিচার করতে পারি নি। মীরজাফররা ক্ষমতার মসনদে বসেছিল। ইংরেজরা সুযোগ নিয়েছিল বাংলাকে গোলামীর রাষ্ট্রে পরিণত করে দুই শতাব্দী শোষণ করার।

তেমনি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার ষড়যন্ত্রের ইতিহাস ভুলে যাওয়া যাবে না। বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশকে মাথা তুলে দাঁড়ানোর প্রত‌্যয়ে এটাই হোক আজকের দিনের প্রত‌্যাশা।

মঙ্গলবার, ৬ আগস্ট, ২০১৯

ডেঙ্গুজ্বরের ইতিবৃত্ত (সংগৃহীত পোস্ট)

Image result for dengue aedes mosquito
তথ‌্যসূত্র: ডা: বুশরা তানজীম
এম.বি.বি.এস, এম.ডি (ভাইরোলজি)

ডেঙ্গুজ্বরের কারণঃ
ডেঙ্গুজ্বর একটি ভাইরাসজনিত রোগ। এটি ডেঙ্গু ভাইরাসবাহী এডিস নামক মশার কামড়ে হয়। এখন পর্যন্ত পৃথিবীতে ৫ ধরণের ডেঙ্গু ভাইরাসের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে- ডেনভি-১, ডেনভি-২, ডেনভি-৩, ডেনভি-৪ এবং ডেনভি-৫ (২0১৩, ইন্ডিয়া)।
ডেঙ্গুজ্বর ৪ প্রকারেরঃ ১) ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গুজ্বর, ২) ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার, ৩) ডেঙ্গু শক সিনড্রোম এবং ৪) এক্সপ্যানডেড ডেঙ্গু সিনড্রোম। মানুষের শরীরে যদি প্রথমবার এই ৫ ডেঙ্গু ভাইরাসের যেকোন একটি দিয়ে সংক্রমিত হয়, তাহলে লক্ষণসমূহ প্রকাশিত অথবা অপ্রকাশিত হতে পারে। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই প্রথমবার ডেঙ্গু সংক্রমণ হলে ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গুজ্বর হয়। এটি কোন ধরনের জটিলতা ছাড়াই শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে যায় এবং ওই নির্দিষ্ট প্রকারের ডেঙ্গু ভাইরাস বিপরীতে রোগ প্রতিরোধকারী এন্টিবডি তৈরি হয় যা ভবিষ্যতে ওই নির্দিষ্ট প্রকারের ডেঙ্গু সংক্রমণকে প্রতিহত করে। আশংকার কথা এই যে, দ্বিতীয়বার ওই ব্যক্তি যদি বাকী ৪ প্রকারের ডেঙ্গু ভাইরাসের যেকোন একটি দিয়ে সংক্রমিত হয়, তাহলে তা মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে যা ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার, ডেঙ্গু শক সিনড্রোম এবং এক্সপ্যানডেড ডেঙ্গু সিনড্রোম নামে চিকিৎসকগণের কাছে পরিচিত। এতে সময়মত চিকিৎসা গ্রহণ না করলে ওই ব্যক্তির মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
সাধারণ ডেঙ্গুজ্বরের লক্ষ্মণসমূহঃ ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গুজ্বর
- জ্বর (১০৪-১০০°F)
- চোখের পেছনে ব্যথা
- মাথাব্যথা
- মাংসপেশীতে ব্যথা
- অস্থি ও অস্থিসন্ধিতে ব্যথা (হাড়ভাঙ্গাব্যথা-ব্রেকবোন ফিভার)
- খাবারে অরুচি
- বমি বমি ভাব এবং বমি
- Rash (মুখমণ্ডল, গলা এবং বুকের চামড়ায় লালচে বর্ণ বা দানা)
ডেঙ্গুজ্বরের সতর্কতামূলক লক্ষণসমূহঃ ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার, ডেঙ্গু শক সিনড্রোম এবং এক্সপ্যানডেড ডেঙ্গু সিনড্রোম
- চামড়ায় ছোট, মাঝারি অথবা বড় আকারের লালচে দানা
- দাঁততে মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া
- নাক দিয়ে রক্তপড়া
- চোখের কোণে রক্তজমা
- প্রচণ্ড পেটে ব্যথা এবং কালো পায়খানা
- অনবরত বমি এবং রক্তবমি
- মেয়েদের মাসিকের সাথে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ
- অতিরিক্ত দুর্বলতা, খিটখিটে স্বভাব এবং অস্থিরতা
- রক্তের চাপ কমে যাওয়া
- তদ্রাচ্ছন্ন, বিভ্রান্ত ও অজ্ঞান হওয়া
- শ্বাসকষ্ট
- পেটের ডানদিকে উপরিভাগে ব্যথা এবং চাকা অনুভব (লিভার বড় হলে)
- শরীরের তাপমাত্রা কমে যাওয়া (<৯৬°F)
- চোখ কোঠরে যাওয়া
- মুখমণ্ডল, জিহ্বা এবং ঠোঁট শুকিয়ে যাওয়া
- ৬ ঘন্টার মধ্যে প্রস্রাব না হওয়া
ডেঙ্গুজ্বরের চিকিৎসা:-
সাধারণ বা ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গুজ্বর কোন ধরনের চিকিৎসা ছাড়াই ৭ দিনের মধ্যে সাধারণত ভাল হয়ে যায়। ডেঙ্গু জ্বরের চিকিৎসা মূলত শরীরের পানির সমতা রক্ষা করা এবং বিশ্রাম। জ্বর কমানোর জন্য প্যারাসিটামল ছাড়া অন্য কোন ধরণের NSAID ব্যবহার করা যাবে না । শরীর স্পঞ্জ করা যেতে পারে। বিশ্রাম এবং সেই সাথে প্রচুর পানি, খাবার স্যালাইন, ডাবের পানি এবং পছন্দ সই তাজা ফলের রস খেতে হবে এবং সেই সাথে ডেঙ্গুজ্বরের সতর্কতামূলক লক্ষণ গুলো লক্ষ্য রাখতে হবে। এর যেকোন একটি লক্ষণ ও যদি প্রকাশ পায় তাহলে যত দ্রুত সম্ভব হসপিটালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিতে হবে অন্যথায় মৃত‌্যু ঝুঁকি বেড়ে যাবে। তবে ২০১৯ সালের ডেঙ্গুর ভাইরাসের সংক্রমনের ফলে ডেঙ্গু শক সিনড্রোম এবং এক্সপ্যানডেড ডেঙ্গু সিনড্রোম দেখা যাচ্ছে এবং এর কারনে অনেক প্রাণ অকালে ঝরে যাচ্ছে। দু’একদিনের জ্বরে শরীরের রক্তচাপ কমে গিয়ে রোগী শকে চলে যাচ্ছেন। জ্বরে শরীরের তাপমাত্রাও থাকছেও কম, ১০০-১০২°F। এসব জটিলতা এড়াতেই অপেক্ষা না করে প্রথমদিনের জ্বরেই বি.এম.ডি.সি কতৃক রেজিস্ট্রেশনপ্রাপ্ত একজন এম.বি.বি.এস. চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরী। চিকিৎসক যদি মনে করেন রোগী বাসায় চিকিৎসা নেওয়ার জন্য উপযোগী তা হলে বাসায় চিকিৎসা নেয়া যেতে পারে।
এছারাও চিকিৎসকগণ কিছু রোগীগণকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন যাদের জ্বর হলে প্রথম দিনেই হসপিটালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিতে পরামর্শ দিয়েছেন, যেমনঃ
(১) এক বছরের কম বয়সী বাচ্চা
(২) গর্ভবতী মা
(৩) বৃদ্ধ
(৪) ডায়াবেটিক
(৫) হার্টেরসমস্যা
(৬) উচ্চরক্তচাপ
(৭) কিডনির সমস্যা
(৮) লিভারের সমস্যা
ডেঙ্গু ভাইরাস প্রতিরোধে করণীয়ঃ
ডেঙ্গু ভাইরাস প্রতিরোধের একমাত্র উপায় হচ্ছে এসিড মশার বংশ বৃদ্ধি রোধ এবং এর কামড় থেকে রক্ষা পাওয়া। নিম্নলিখিতভাবে বিষয় গুলো সম্পর্কে সচেতন হলে এডিস মশাকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। দরকার সরকারের পাশাপাশি প্রত্যেকের স্বতন্ত্র উদ্যোগ। নিম্নলিখিত উপায়ে ডেঙ্গু ভাইরাস সংক্রমণ থেকে বাঁচা সম্ভবঃ
- ঘরের ভিতরে এবং বাহিরে জমে থাকা পানি ৩ দিনের মধ্যে অপসারণ, যেমনঃ ফুলের টব, ফুলদানী, একুরিয়াম, আর্টিফিশিয়াল ঝর্ণা, ডাবের খোসা, টায়ার এমনকি বার্থরুমের ভেজা ফ্লোর, বেসিন এবং কমোড।
- ঘরের দরজা-জানালায় নেট ব্যবহার
- দিনের বেলায় মশারী টানিয়ে ঘুমানো
- লম্বা জামা এবং প্যান্ট পরিধান
- মশার রিপিল্যান্ট (ওডোমস) ব্যবহার
- আক্রান্ত রোগীকে মশারির মধ্যে রাখা এবং অসুস্থ অবস্থায় অন্য এলাকায় ভ্রমন থেকে বিরত থাকা
ডেঙ্গু জ্বরের ভ‌্যাক্সিন:
ডেংভাক্সিয়া (Dengvaxia) নামে সানোফি পাস্তুরের একটি ভ্যাকসিন রয়েছে যা এখনও বাংলাদেশে অনুমোদিত নয়। এই ভাক্সিনটি ২০১৬ সালে ১১ টি দেশে অনুমোদিত হয়েছিল, যেমন, মেক্সিকো, ফিলিপাইন, ইন্দিনেশিয়া, ব্রাজিল, সাল্ভাদর, কোস্টারিকা্‌, পারাগুয়ে, গুয়েতিমানা, পেরু, থাইল্যান্ড এবং সিঙ্গাপুর। তন্মধে, ফিলিপাইনে দু’বছর ভ্যাকসিন ব্যাবহারের পর তা বন্ধ করে দেয়া হয়। কারন, এই ভাক্সিন শুধুমাত্র পূর্ববর্তী সংক্রমিত ব্যাক্তিদের কার্যকর কিন্তু, অসংক্রমিত ব্যাক্তিদের ক্ষেত্রে এটি জটিলাকার ধারন করে। ভাক্সিন দেয়ার পর কিছু বাচ্চার মৃত্যু হলে তাদের পিতা-মাতা দাবী করেন যে এটি ভ্যাক্সিনজনিত জটিলতার ফল। হয়তো ভবিষ্যতে আরো গবেষণার পর এই ভ‌্যাক্সিন গ্রহণযোগ্য হবে আর ততদিন আমাদের ডেঙ্গু প্রতিরোধের একমাত্র উপায় হচ্ছে এসিড মশা দমন।
২০১৯ সালে বাংলাদেশে ডেঙ্গু জ্বরের ভয়াবহতা এবং নিজস্ব কিছু মতামতঃ-
যেহেতু, প্রথমবার ডেঙ্গু সংক্রমনে অনেক ক্ষেত্রেই লক্ষণ অপ্রকাশিত থাকে এবং এমনকি লক্ষণ থাকলেও অনেক চিকিৎসগণই ডেঙ্গুর সনাক্তকরনে কোন টেস্ট করানোর জন্য আগ্রহী নন, কারণ, ডেঙ্গু ভাইরাসের জন্য আলাদা কোন ঔষধ নাই, চিকিৎসা শুধু উপসর্গগুলো নিয়ন্ত্রণ করা, তাই, প্রথম ডেঙ্গু সংক্রমণ অনেক ক্ষেত্রেই নির্ণয় হয় না, সেহেতু এবার যেসব রোগীগণ ডেঙ্গু শক সিনড্রোম এ আক্রান্ত হয়েছেন অথবা মৃত্যুবরণ করেছেন, তাদের পূর্ববর্তী ডেঙ্গু সংক্রমনের আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেয়া যায় না। পাশাপাশি ডেঙ্গু প্রথমবার এবং দ্বিতীয়বার সংক্রমণে কোন গবেষণাপত্র তেমনভাবে খুঁজে পাওয়া যায় না। IEDCR এর তথ্যমতে, বাংলাদেশে ডেনভি-১, ডেনভি-২ এবং ডেনভি-৩ এর অস্তিত্বের সন্ধান পাওয়া গেছে । IEDCR এর তথ্যমতে ২০১৯ সালে ডেন-৩ দিয়ে সংক্রমণের হার বেশী লক্ষ করা যাচ্ছে । পূর্ববর্তী গবেষণায় দেখা যায় যে ডেন-৩ দিয়ে সংক্রমনে ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার এবং ডেঙ্গু শক সিনড্রোম হার অন্যান্য দেশে ছিল তুলনামুলকভাবে বেশি। আবার এমনও হতে পারে বাংলাদেশে ডেঙ্গু ভাইরাসগুলোর মিউটেশনের ফলে নতুন প্রকারের একটি ডেঙ্গু ভাইরাস তৈরী হয়েছে যেজন্যে জটিলটা বেশী হচ্ছে। এজন্য দরকার ভবিষ্যত গবেষণা। তবে একজন Virologist হিসেবে আমি ডা: বুশরা তানজীম  মনে করি যে, প্রত্যেক চিকিৎসকগণকে রোগীদের প্রথমবার ডেঙ্গু জ্বরের আশংকা হলে ডেঙ্গু ভাইরাস সনাক্ত করণ জরুরী।

বি.দ্র.: এই লেখাটি জনস্বার্থে ব্লগে পুণঃপ্রকাশ করায় ডা: বুশরা তানজীম, এম.বি.বি.এস, এম.ডি (ভাইরোলজি) প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ধন‌্যবাদ জ্ঞাপন করছি।

মঙ্গলবার, ২ জুলাই, ২০১৯

বিরহ বচন (স্বরচিত কবিতা)

বিরহ বচন

নতুন স্বপ্ন দেখেছিলাম তোমায় নিয়ে
কি থেকে কি হয়ে গেল বুঝলাম না প্রিয়ে।
পলিটিক্সের গ্যাড়াকলে আটকে গেছে সম্পর্ক
বেঁচে থাকার আনন্দটুকু হয়েছে আজ বড়ই বিমর্ষ।
ভালো না লাগা দিনগুলোর প্রহর কাটে নিরানন্দে
তুমি আসবে মনে প্রবোধ জাগে কেন জানি নে।


সোমবার, ৬ মে, ২০১৯

আইইউবি-র বিংশতম (আমার পোস্ট গ্র‌্যাজুয়েট) সমাবর্তন ২০১৯



ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের (আইইউবি) বিংশতম সমাবর্তনের সমাবর্তন বক্তা বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ কর্তৃক প্রদত্ত বক্তব‌্য:

আমি প্রথমেই একটা ছোট্ট গল্প দিয়ে আমার কথার শুরু করি। গল্পটা এ রকম যে, এক হাসপাতালে পেটে প্রচণ্ড ব্যথা নিয়ে এক রোগী এল। সঙ্গে সঙ্গে তার এক্স-রে করা হলো। কিন্তু একি! রোগীর পেটের মধ্যে শত শত চায়ের চামচ দেখা গেল। তখন জিজ্ঞাসা করা হলো, ‘তোমার পেটে এত চায়ের চামচ এল কী করে?’ সে তখন কাঁদতে কাঁদতে উত্তর দিল, ‘স্যার, ওই যে বিখ্যাত ডাক্তার কাদির সাহেব, এফসিপিএস, এমআরপিএস বলেছেন দিনে দুই চামচ করে তিনবার খেতে।’

তো আমরা এই ডাক্তার কাদির সাহেবের মতো মানুষ দ্বারাই আসলে পরিচালিত হই। তারা যা বলেন, আমরা তা-ই করি। আমরা কখনো দেখি না চায়ের চামচ খাওয়া ভালো, না খারাপ। এটা আমরা ভাবি না। এতে আমাদের কোনো ভালো-খারাপ কিছু হয় কি না, সেটা আমরা বুঝতে পারি না। আমাদের জীবনে এই ডাক্তার কাদির কারা? এই কাদির হচ্ছেন আমাদের অভিভাবক, আত্মীয়, আমাদের বন্ধুবান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশীসহ গোটা পৃথিবী। তারা আমাদের যা করতে বলেন আমরা তা-ই করি। যেমন: আমার আব্বার কাছে শুনেছি যে তারা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত তখন বলা হতো যে গণিত আর দর্শনই সেরা বিষয়। তাই এ দুটো পড়তে হবে। আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পা দিলাম, তখন যুগ পাল্টে গেল। তখন সেরা হলো ডাক্তারি, ইঞ্জিনিয়ারিং। আবার মানবিকের শিক্ষার্থী হলে ইংরেজি অথবা অর্থনীতি। কারণ ওই দুটো দিয়ে সিএসপি হওয়ার সুবিধা ছিল। তারপর আরও সময় পার হলো। এখন এসে দাঁড়িয়েছে বিবিএ, এমবিএ। একের পর এক চাপের মধ্যে আমরা পিষ্ট হয়ে যাচ্ছি। কিন্তু আমরা এর বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারছি না। কোনোকালেই আসলে কেউ কিছু করে উঠতে পারেনি। আমি কী চাই, আমি কী করতে ভালোবাসি, আমার প্রাণ কী চায়, আমার জীবনের আনন্দ কোথায়—এই খবর কেউ নিতে আসে না। ফলে আমরা সারা জীবন ধরে আমাদের হৃদয়ের সঙ্গে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চালিয়ে যাই।

আমরা আমাদের কোনো দিন চিনতে পারি না। নিজেদের কোনো দিন খুঁজে বের করতে পারি না। আমরা আমাদের আনন্দজগৎকে তাই কোনো দিন আত্মস্থ করতে পারি না। অবশ্য এ রকম হওয়ার কারণ আছে। কেন আমাদের এসব বলা হয়? একটা কারণ হলো দারিদ্র্য। আমাদের দেশে কিছুসংখ্যক মানুষ ছাড়া বাকি সব মানুষ দারিদ্র্যসীমার এত নিচে থাকে যে নিজের ইচ্ছামতো কিছু করার ক্ষমতা থাকে না। নিজের প্রাণের খোরাক জোগানোর সুযোগ আমরা কমই পাই। সুতরাং যেখানে অর্থ আছে, যেখানে টাকা আছে সেখানে আমাদের চলে যেতে হয়। সেটা আমাদের ভালো লাগুক আর না-ই লাগুক।

আরেকটা সমস্যা হলো আমাদের বাবা–মাকে নিয়ে। যেমন আমরা ১১ ভাইবোন ছিলাম। আমার দাদারা ছিলেন মাত্র ১৮ ভাই এবং ১৪ বোন। এত ছেলে-মেয়ে সেকালে থাকত যে বাবা-মা তাদের ঠিক দেখেশুনে রাখতে পারত না। তাই তাদের নিয়ে তেমন কোনো চাপ ছিল না। তারা নিজেদের যা ইচ্ছা তাই হতে পারত। কিন্তু আজকে ছেলেমেয়ের সংখ্যা ২–এ নেমে এসেছে। সব সময় বাবা-মায়ের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি যে তাঁর ছেলেমেয়ে কী করছে। আজকের ছেলেমেয়েরা যেন বন্দিশালাতে আটকে আছে। সর্বদা নজরদারির কড়া শিকলে বন্দী তারা। আজকের মতো অত্যাচারিত শিশু আমাদের দেশে কখনো ছিল না। সবচেয়ে বড় কথা, বাবা-মা যা হতে পারেননি, ওই ১-২ জন ছেলেমেয়ে দিয়ে তারা তার প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করেন। এটা তো বড় কঠিন কাজ। এই বাচ্চা ছেলেমেয়ে কীভাবে এই বড় দায়িত্ব পালন করবে।

এরপর এল চাকরি। চাকরি এক মজার জায়গা। এখানে বাণিজ্যিক প্রভুরা তাঁদের মর্জি চালান। তিনজন মানুষ লাগবে। নেবে একজন। তাকে আবার বেতন দেবে দুজনের। তাতে টাকার পরিমাণ বাড়ে। সাথে যে চাকরি পেল সে নিজেও এত টাকা পেয়ে খুশি হয়। কিন্তু সকাল আটটায় অফিসে ঢুকে রাত ১০টা নাগাদ বাসায় ফেরার পর তার মনে আর কোনো শান্তি থাকে না। বাড়ির টেলিভিশনের সামনে টাইটা খুলে দিয়ে সে ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ে। এই দৃশ্যটা দেখতে মোটেও ভালো লাগে না। তাদেরকে চিপে, পিষে তাদের সমস্ত রক্ত আমরা নিয়ে যাচ্ছি। ঊনবিংশ শতাব্দীতেই এটা নিয়ে আন্দোলন হয়েছিল। তখন কবি বলেছিলেন,

What is this life if, full of care,
We have no time to stand and stare.

এই যে ঊর্ধ্বশ্বাস জীবন, এই যে কাজ, এই যে ব্যস্ততা—এসব মিলিয়েই কি আমাদের জীবন? আমরা কি একটু দাঁড়াতে পারব না? আমরা কি একবার এই চারপাশের সুন্দর পৃথিবীর দিকে তাকানোর সুযোগ পাব না? এত অসাধারণ–অবিশ্বাস্য পৃথিবীতে আমরা যে এসেছি, সেটার কোনো আনন্দ কি আমরা নিতে পারব না? কেন এই কথা হয়েছিল? ১৮১৯ সালের দিকে ইংল্যান্ডে একটা আইন পাস হয়েছিল। কাউকে ২০ ঘণ্টার বেশি কাজ করানো যাবে না। কী রকম মারাত্মক আইন আপনি চিন্তা করুন। তখন হয়তো ২২ ঘণ্টা খাটানো হতো। হয়তো কর্মীকে তারা ঘুমাতেই দিত না। এ রকম ভয়ংকর নির্যাতনও সেই সময়ে করা হয়েছে মানুষের ওপর। এই যে ‘মে ডে’তে শিকাগোতে শ্রমিকদের ওপরে গুলি করা হয়েছিল। শ্রমিকেরা কী চেয়েছিল? শুধু ৮ ঘণ্টা কাজ, ৮ ঘণ্টা ঘুম আর ৮ ঘণ্টা আনন্দ করার সুযোগ চেয়েছিল। কিন্তু প্রভুরা বলেছিল যে ৮ ঘণ্টা আনন্দ করা চলবে না। সেটার ভেতর ৬ ঘণ্টা তাদের জন্য কাজ করতে হবে। এই নিয়ে শেষ পর্যন্ত এ রকম দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছে।

আমি আরেকটা ছোট্ট গল্প দিয়ে শেষ করি। পথে যেতে যেতে একজন যুবকের সঙ্গে দেখা হলো অপূর্ব এক সুন্দরীর। সুন্দরীকে দেখেই সে প্রেমিক যুবক বলে বসল, ‘আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই।’ আবার সুন্দরীরও এই যুবককে অপছন্দ নয়। তারও ভালো লেগেছে। কিন্তু সে বলল, ‘আমি একটু অসুবিধায় আছি। আমার বাড়ি হলো সাত সমুদ্রের ওপারে। আমি আমার বাবার সঙ্গে সেখানে যাচ্ছি। এখন তো আর আমাদের বিয়ে সম্ভব নয়। তুমি সেখানে এসো। তখন আমি এই বিষয়ে ভেবে দেখব।’

যুবক তো আর অপেক্ষা করতে পারল না। কিছুদিন পরেই সে সুন্দরীর জন্য সাত সমুদ্রের উদ্দেশে পাড়ি জমাল। প্রথম সমুদ্রের পাড়ে সে যখন গেল, সেখানে এক খেয়া মাঝি সাগর পার করে দেবে। সেই খেয়া মাঝি তাকে বলল, ‘আমি চাইলেই তোমাকে এই সমুদ্র পার করে দিতে পারি। কিন্তু এ জন্য তোমাকে তোমার হৃৎপিণ্ডের সাত ভাগের এক ভাগ দিয়ে দিতে হবে।’ সে ভাবল যে তার এত গভীর প্রেম। প্রেমের জন্য না হয় একটু ত্যাগ স্বীকার সে করলই। সে রাজি হয়ে যায় মাঝির কথায়। পার হলো সে প্রথম সাগর। দ্বিতীয় সাগরের খেয়া মাঝিও একই কথা বলল। এভাবে দিতে দিতে সাত সমুদ্র সে যখন পার হলো তখন দেখা গেল তার মাঝে হৃদয় বলে আর কিছুই নেই। তার হৃদয় খণ্ড খণ্ড হয়ে হারিয়ে গেছে।

এই যে আমাদের সময়ের ওপর যে নিষ্পেশন, যে টানাপোড়া চলে এই আমাদের ব্যস্ত জীবন নিয়ে, সেটা আমাদের জন্য কোনো সুফল বয়ে আনে না। আমাদের জীবন যে আনন্দের এক নতুন উৎস, সেটা আমাদের মনে রাখতে হবে। জীবনের এই আনন্দ আমরা খুঁজে পাই সময়ের কাছ থেকে। কেউ যদি আমাদের কাছ থেকে এই সময়কেই কেড়ে নেয়, তাহলে আমরা কীভাবে সুখী হয়ে বেঁচে থাকব? আমরাও যদি আমাদের সময়কে অন্য কাউকে দিয়ে দিতে থাকি, তাহলে আমাদের জীবন কোথায়? কীভাবে আমরা আমাদের ভেতরের মানুষকে গড়ে তুলব?

নাসিরুদ্দিন হোজ্জার একটা গল্প আছে যে এটা যদি বিড়াল হয় তাহলে কাবাব কোথায়। আবার এটাই যদি কাবাব হয় তাহলে বিড়ালটা কোথায়। তো এই জীবন যদি জীবন হয় তাহলে আসল জীবন কোথায়? তাই আমি এই তরুণদের কাছে বলব রবীন্দ্রনাথের একটি কথা:

‘বিশ্বরূপের খেলাঘরে কতই

গেলেম খেলে,

অপরূপকে দেখে গেলেম

দুটি নয়ন মেলে।’

এই যে অপরূপ বিশ্ব—তা আমাদের চোখ দিয়ে, আমাদের ইন্দ্রিয় দিয়ে আমাদের জীবন দিয়ে যদি উপভোগ না করে যাই তাহলে আর এই জীবনের মানে কী? আমি সবাইকে অনুরোধ করব এই বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে। কেননা তোমরা এখন জীবনের পথে অগ্রসর হতে যাচ্ছ। তোমাদের এখনই ভাবার সময়। পরে আর এসব ভেবে কোনো লাভ হবে না। তোমাদের আগামী সময়ের জন্য শুভকামনা রইল। সকলকে ধন্যবাদ।

শুক্রবার, ১৯ এপ্রিল, ২০১৯

রবীন্দ্রনাথের গানে রোমান্টিক ভালবাসার দ্বন্দ

লেখকের লেখনীতে মনের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ যখন ঘটে তখন দূরীভূত হয় অবদমিত সংশয়। কবিগুরু রবীঠাকুর অনেক লেখায় ও গানে তিনি এই চিরাচরিত মানব মনের দ্বন্দ্বকে প্রিজমের কাঁচের ছোঁয়ার ন‍্যায় সপ্তবর্ণে রহস্যাবৃত খোলস থেকে বের করে শব্দের কারুকাজে লেখনীতে পুলক সঞ্চার করেছেন। অসংখ্য সৃষ্টির মাঝে রবীঠাকুরের একটি গান উদাহরণ হিসেবে দেখাতে পারি। "ভালবেসে যদি সুখ নাহি, তবে মিছে কেন এই ভালবাসা"। মানুষের যাপিত জীবনের সবচেয়ে শক্তিশালী আবেগ রোমান্টিক ভালবাসা নিবেদনের আকুলতা, পাওয়ার আশা না-পাওয়ার বেদনার গভীরতা এবং ভালবাসার এক পর্যায়ে আমিত্ব বা আপন অস্তিত্ব সংকট প্রায় সবকিছুই চক্রাকারে উঠে এসেছে এই গানটিতে। অনেক শিল্পীর মধ‌্যে সুস্মিতা পাত্রের কণ্ঠে গাওয়া এই গানটি আমার কাছে সবচেয়ে ভালো লেগেছে।


ভালোবেসে যদি সুখ নাহি
তবে কেন,
তবে কেন মিছে ভালোবাসা।
মন দিয়ে মন পেতে চাহি।
ওগো কেন,
ওগো কেন মিছে এ দুরাশা।
হৃদয়ে জ্বালায়ে বাসনার শিখা,
নয়নে সাজায়ে মায়া-মরীচিকা,
শুধু ঘুরে মরি মরুভূমে।
ওগো কেন,
ওগো কেন মিছে এ পিপাসা।
আপনি যে আছে আপনার কাছে,
নিখিল জগতে কী অভাব আছে।
আছে মন্দ সমীরণ, পুষ্পবিভূষণ,
কোকিল-কূজিত কুঞ্জ।
বিশ্বচরাচর লুপ্ত হয়ে যায়,
এ কী ঘোর প্রেম অন্ধ রাহুপ্রায়
জীবন যৌবন গ্রাসে।
তবে কেন,
তবে কেন মিছে এ কুয়াশা।

যদিও প্রখ্যাত রোমান্টিক ভালবাসা গবেষক ইভ‍্যুলুশন‍্যারী এনথ্রোপলিস্ট ড. হেলেন ফিশার মনে করেন রোমান্টিক গানগুলোতে লিরিসিস্টগণ বা গীতিকারেরা মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে থাকেন, কিন্তু এই গানটি আমার বিবেচনায় কিছুটা ব‍্যতিক্রম। ঐ যে প্রথমে বলেছিলাম অবদমিত সংশয়ের যাতনার সচেতন মুক্তি ঘটে লেখনীতে, তেমনি একটি গান এটি। তবে সুখ জিনিসটি যেখানে পারতপক্ষে আপেক্ষিক সেখানে রবীঠাকুর যখন "যদি" শব্দের আশ্রয়ে রোমান্টিক ভালবাসার সাথে তুলনীয় করে দিলেন তখন ভালবাসা আত্মস্বার্থকেন্দ্রিক আবেগ-অনুভূতির একপ্রকার বিনিময়ে পরিণত হলো না, বৈকি!

সোমবার, ১৮ মার্চ, ২০১৯

চৈত্রের প্রথম বৃষ্টির টাপুর টুপুর শব্দে মন যখন তন্ময়

চৈত্র‌ের শুরুতে বৃষ্টি। সেটা টিনের চালেই হোক কিংবা বাসার ছাদে। বৃষ্টি মনে প্রশান্তির হিমশীতল দ‌্যোতনা সৃষ্টি করে। মনটা ঘরের বাইরে চলে যায় বৃষ্টির ঝিরি ঝিরি শব্দপতনের ছন্দে। প্রকৃতি যেন ধুয়ে মুছে দিয়ে যায় বসন্তের বাতাসে ভেসে আসা ধূলিকণাগুলোকে।

কখনওবা মেঘের গর্জন জানান দেয় অস্থির মেঘের রুদ্রমূর্তির অস্তিত্বকে। আগে তো বিদ‌্যুত চলে যেত দমকা হাওয়ায় খানিকটা ঝড়ো বৃষ্টি বর্ষণেই। ঢাকার শহুরে পরিবেশে বজ্রবৃষ্টি বিদ‌্যুত যাওয়ার বিষয়টি স্মৃতির অংশ হয়ে গিয়েছে।

বৃষ্টি কিছু খাবারের কথা বরাবরই মনে করিয়ে দেয়। ভুনা খিচুরী, চানাচুর কিংবা ঝালমুড়ি বৃষ্টির অলস সময়কে যথেষ্ট উপভোগ‌্য করে তোলে। ছোটবেলায় বৃষ্টিতে ভিজে মফস্বল শহরের বাড়িতে আম কুড়োনোর আনন্দ ছিল একটি অমূল‌্য বিনোদন। দল বেঁধে আম ভর্তা করে খাওয়ায় ছিল যেন অমৃতের স্বাদ।

বৃষ্টিতে ভিজে ফুটবল খেলা; তারপর ভিজতে ভিজতে স্কুল থেকে বাড়ি ফেরা ছিল যেন বীরত্বপূর্ণ একটি মিশন। জ্বরকে তাড়া করে বৃষ্টিতে ভেজা কৈশোরের সাহস দেখানোর অনবদ‌্য অংশ।