শুক্রবার, ১৯ এপ্রিল, ২০১৯

রবীন্দ্রনাথের গানে রোমান্টিক ভালবাসার দ্বন্দ

লেখকের লেখনীতে মনের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ যখন ঘটে তখন দূরীভূত হয় অবদমিত সংশয়। কবিগুরু রবীঠাকুর অনেক লেখায় ও গানে তিনি এই চিরাচরিত মানব মনের দ্বন্দ্বকে প্রিজমের কাঁচের ছোঁয়ার ন‍্যায় সপ্তবর্ণে রহস্যাবৃত খোলস থেকে বের করে শব্দের কারুকাজে লেখনীতে পুলক সঞ্চার করেছেন। অসংখ্য সৃষ্টির মাঝে রবীঠাকুরের একটি গান উদাহরণ হিসেবে দেখাতে পারি। "ভালবেসে যদি সুখ নাহি, তবে মিছে কেন এই ভালবাসা"। মানুষের যাপিত জীবনের সবচেয়ে শক্তিশালী আবেগ রোমান্টিক ভালবাসা নিবেদনের আকুলতা, পাওয়ার আশা না-পাওয়ার বেদনার গভীরতা এবং ভালবাসার এক পর্যায়ে আমিত্ব বা আপন অস্তিত্ব সংকট প্রায় সবকিছুই চক্রাকারে উঠে এসেছে এই গানটিতে। অনেক শিল্পীর মধ‌্যে সুস্মিতা পাত্রের কণ্ঠে গাওয়া এই গানটি আমার কাছে সবচেয়ে ভালো লেগেছে।


ভালোবেসে যদি সুখ নাহি
তবে কেন,
তবে কেন মিছে ভালোবাসা।
মন দিয়ে মন পেতে চাহি।
ওগো কেন,
ওগো কেন মিছে এ দুরাশা।
হৃদয়ে জ্বালায়ে বাসনার শিখা,
নয়নে সাজায়ে মায়া-মরীচিকা,
শুধু ঘুরে মরি মরুভূমে।
ওগো কেন,
ওগো কেন মিছে এ পিপাসা।
আপনি যে আছে আপনার কাছে,
নিখিল জগতে কী অভাব আছে।
আছে মন্দ সমীরণ, পুষ্পবিভূষণ,
কোকিল-কূজিত কুঞ্জ।
বিশ্বচরাচর লুপ্ত হয়ে যায়,
এ কী ঘোর প্রেম অন্ধ রাহুপ্রায়
জীবন যৌবন গ্রাসে।
তবে কেন,
তবে কেন মিছে এ কুয়াশা।

যদিও প্রখ্যাত রোমান্টিক ভালবাসা গবেষক ইভ‍্যুলুশন‍্যারী এনথ্রোপলিস্ট ড. হেলেন ফিশার মনে করেন রোমান্টিক গানগুলোতে লিরিসিস্টগণ বা গীতিকারেরা মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে থাকেন, কিন্তু এই গানটি আমার বিবেচনায় কিছুটা ব‍্যতিক্রম। ঐ যে প্রথমে বলেছিলাম অবদমিত সংশয়ের যাতনার সচেতন মুক্তি ঘটে লেখনীতে, তেমনি একটি গান এটি। তবে সুখ জিনিসটি যেখানে পারতপক্ষে আপেক্ষিক সেখানে রবীঠাকুর যখন "যদি" শব্দের আশ্রয়ে রোমান্টিক ভালবাসার সাথে তুলনীয় করে দিলেন তখন ভালবাসা আত্মস্বার্থকেন্দ্রিক আবেগ-অনুভূতির একপ্রকার বিনিময়ে পরিণত হলো না, বৈকি!